বকশীগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি: সরকারের ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’-এর মূল লক্ষ্য ছিল গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারকে নিরাপদ আবাসন প্রদান করা। কিন্তু জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর ডুমুরতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে সেই স্বপ্ন আজ অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। ২৮টি পরিবারের জন্য নির্মিত ঘরের মধ্যে বর্তমানে বসবাস করছে মাত্র ১০টি পরিবার। বাকি ঘরগুলো পড়ে আছে ফাঁকা, পরিণত হচ্ছে ভূতুড়ে বাড়িতে।
২০২১-২২ অর্থ বছরের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে বকশীগঞ্জে ২১২টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ১৪২টি, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫০টি এবং তৃতীয় পর্যায়ে ২০টি ঘর অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রথমে সবগুলো ঘর অসহায় গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও ঘর নির্মাণে বসবাসের অনুপযোগী জায়গা নির্ধারণ, অনিয়ম ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশিরভাগ ঘরে এখন পর্যন্ত মানুষের বসতি গড়ে ওঠেনি এবং ঘরগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।


উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের ডুমুরতলা প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ২৮টি ঘরের মধ্যে ১৮টি ঘরেরই দরজা-জানালা বন্ধ ও তালাবদ্ধ। অনেক ঘর ফাটল ধরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব ঘরে নেই কোনো বাসিন্দা, নেই জীবন চিহ্ন। ঘরগুলোর চারপাশে আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে পরিবেশ। রাতে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে অন্ধকার ও নির্জন। শুরুতে ২৮টি পরিবার এখানে উঠেছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার অভাবে একে একে অনেকে প্রকল্পের ঘর ছেড়ে চলে গেছেন।

রাত হলেই বাড়ে ভয়। প্রকল্পের চারপাশে বিস্তীর্ণ পাহাড় ও ঝোপঝাড় থাকায় বন বিড়াল ও শেয়ালের উপদ্রব দেখা যায়। রাস্তায় ও বাহিরে নেই কোনো লাইটের ব্যবস্থা ঘুটঘুটে অন্ধকারে শিশু ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকেন পরিবারগুলো।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল অসহায় মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রয়োজনীয় তদারকি ও সহায়তার অভাবে প্রকল্পটি এখন অনেকটাই প্রাণহীন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অবশিষ্ট পরিবারগুলোর পক্ষেও সেখানে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরি নজরদারি ও কার্যকর উদ্যোগই পারে কামালপুর ডুমুরতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পকে আবার প্রাণবন্ত করে তুলতে।
বর্তমানে বসবাসরত ১০টি পরিবার অভিযোগ করেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পাওয়ার পর আর কোনো সরকারি সহায়তা বা পুনর্বাসন সুবিধা তারা পাননি।
প্রকল্পে বসবাসরত বাসিন্দা মো. বিজয়, নুর হোসেন ও কাপাসি বেগম বলেন, “আমরা ঘর পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু কাজের ব্যবস্থা নেই, নিরাপত্তা নেই। কোনো ভাতা বা সহযোগিতাও পাচ্ছি না। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।”
তারা আরও জানান, আমাদের নিয়মিত খাদ্য সহায়তা নেই, বিদ্যুতের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, চিকিৎসা ও শিক্ষা সুবিধা এখান থেকে অনেক দূরে। রাত হলে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। শেয়ালের ডাক শোনা যায়। বাচ্চারা ভয় পায়, আমরাও আতঙ্কে থাকি।
স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবি, পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই ফাঁকা ঘরগুলোতে দ্রুত নতুন পরিবার পুনর্বাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা, সোলার লাইটসহ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার পাশাপাশি নিয়মিত সরকারি তদারকি, সহায়তা প্রদান, আশপাশ পরিষ্কার ও ঝোপঝাড় অপসারণ করা।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের অভিযোগ নিয়ে কামালপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাপ জামালের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘ডুমুরতলা আশ্রয়ণ কেন্দ্রে বর্তমানে কতজন পরিবার আছে বা গেছে তা বর্তমানে জানা নেই’।
এছাড়া তার বক্তব্যে জানা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পে থাকা পরিবারের কোনো খোঁজ খবর রাখেন না।
বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল হাই বলেন, প্রকল্পগুলো সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসরত কোনো পরিবার যদি সরকারি কোনো সহায়তা না পেয়ে থাকে তাদের দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available