• ঢাকা
  • |
  • মঙ্গলবার ২৩শে চৈত্র ১৪৩২ রাত ০১:৫৪:৪০ (07-Apr-2026)
  • - ৩৩° সে:

চোখে আলো ছিল না, তবু থামেনি আজান

দড়ি ধরে মসজিদে যাওয়া সেই মুয়াজ্জিনের চিরবিদায়

৬ এপ্রিল ২০২৬ বিকাল ০৪:৫৫:৫৫

দড়ি ধরে মসজিদে যাওয়া সেই মুয়াজ্জিনের চিরবিদায়

নাটোর প্রতিনিধি: দড়ি আর বাঁশ ধরে প্রতিদিন মসজিদে যেতেন তিনি। চোখে আলো ছিল না, তবুও হৃদয়েছিল অটুট ঈমান আর আল্লাহর ঘরের প্রতি গভীর ভালোবাসা। অন্ধত্ব, বয়স কিংবা দূরত্ব কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারেনি। সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও ধর্মপ্রাণতার অনন্য দৃষ্টান্ত, নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার ১২০ বছর বয়সী অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লা আর নেই।

৫ এপ্রিল রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নিজ বাড়িতে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

Ad
Ad

তিনি বড়াইগ্রাম উপজেলার নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। সোমবার সকাল ৯টায় বড়দেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজার নামাজ শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

Ad

এই বর্ষীয়ান ধর্মপ্রাণ মানুষটিকে নিয়ে ২০২৪ সালের ১৩ মে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তার জীবনসংগ্রাম ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে হঠাৎ করেই তার দৃষ্টিশক্তি চলে যায়। দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আশায় তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। কিন্তু অনেক চিকিৎসা করানোর পরও তার দৃষ্টি আর ফিরে আসেনি। তবুও তিনি হতাশ না হয়ে আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখে জীবনযাপন করে গেছেন। এর কয়েক বছর পর বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে পবিত্র হজ পালন করেন তিনি। দেশে ফিরে নিজ গ্রামে প্রায় ৫ শতাংশ জমির ওপর একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করেন এবং সেই জমি মসজিদের নামেই রেজিস্ট্রি করে দেন। নিজের সম্পদ নয়, আল্লাহর ঘর গড়ার স্বপ্নই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

পরবর্তীতে নিজেই সেই মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। কিন্তু চোখে দেখতে না পাওয়ায় মসজিদে যাতায়াতে জটিলতা দেখা দেয়। বাড়ি থেকে মসজিদের দূরত্ব ছিল প্রায় ২০০ মিটার। তখন তিনি নিজেই একটি ব্যতিক্রমী ও সাহসী উপায় বের করেন। তার পরামর্শে সন্তানরা বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তায় দড়ি ও বাঁশ টাঙিয়ে দেন, যাতে তিনি তা ধরে ধরে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন।

প্রথম দিকে ছেলে ও নাতিরা তাকে পথ দেখিয়ে মসজিদে নিয়ে যেতেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি সেই পথ চিনে নেন। এরপর থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দড়ি ও বাঁশের সাহায্যে নিয়মিত মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান দিয়ে গেছেন তিনি। বৃষ্টি, রোদ কিংবা শীত—কোনো প্রতিকূলতাই তাকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

মরহুমের মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লার বড় ছেলে মো. শফিকুল ইসলাম সাইফুল মাস্টার ও বড়দেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, আমার বাবা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও দৃঢ়চেতা মানুষ। চোখে দেখতে না পেলেও তিনি কখনো নামাজ বা আজান বন্ধ করেননি। আমাদের সবসময় বলতেন, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ঈমান ও সৎকর্ম। আমরা বাবার আদর্শ ধরে রেখে তার গড়া মসজিদ ও ইবাদতের ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করব।

মরহুমের আরেক ছেলে রফিকুল ইসলাম, বড়দেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বলেন, বাবা আমাদের শিখিয়েছেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে। তিনি কখনো নিজের কষ্টের কথা ভাবেননি, বরং সবসময় অন্যের উপকার করার চেষ্টা করেছেন। তার জীবন আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে।

ছোট ছেলে মো. সাগর হোসেন আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমাদের বাবা ছিলেন আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি ও অনুপ্রেরণা। চোখে দেখতে না পেলেও তিনি কখনো হতাশ হননি। দড়ি ধরে প্রতিদিন মসজিদে গিয়ে আজান দেওয়ার দৃশ্য আমরা কোনোদিন ভুলতে পারব না। বাবার শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।

এদিকে, আব্দুর রহমান মোল্লার মৃত্যুর পরও থেমে নেই তার গড়ে তোলা ইবাদতের সেই ধারা। বর্তমানে তার নিজ হাতে নির্মাণ করা মসজিদেই মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তার সন্তান ও নাতিরা। তারা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত আযান দিচ্ছেন এবং জামাতে নামাজ আদায় করছেন, যেন বাবার রেখে যাওয়া আমানত অক্ষুণ্ন থাকে।

পরিবার ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আব্দুর রহমান মোল্লা ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, সৎ ও দানশীল একজন মানুষ। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি সবসময় চেষ্টা করতেন। তার নম্র আচরণ, ধর্মপ্রাণ জীবনযাপন এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি এলাকার মানুষের কাছে তাকে একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।

স্থানীয়রা বলেন, একজন মানুষ হয়তো চলে যান, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ভালো কাজ ও আদর্শ কখনো হারিয়ে যায় না। আব্দুর রহমান মোল্লার জীবনও তেমনই তার গড়া মসজিদে প্রতিদিন ভেসে ওঠা আজানের ধ্বনিতেই যেন তিনি আজও বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।

Recent comments

Latest Comments section by users

No comment available

সর্বশেষ সংবাদ












Follow Us